সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং

ad by Awesome Technologies

প্রথমেই আসা যাক সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং জিনিসটা কি?

তার আগে চলুন সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এর সাথে পরিচিত হয়ে নেই। উইকিপিডিয়াতে সোশ্যাল মিডিয়া এর একটি সংজ্ঞা দেওয়া আছে। Andreas Kaplan এবং Michael Haenlein নামের দুইজন মার্কেটিং গুরু এর মতে, “ইন্টারনেট ভিত্তিক কিছু এপ্লিকেশন যা ২য় প্রজন্মের ওয়েবের ভাবাদর্শ ও প্রযুক্তি দ্বারা তৈরি এবং একই সাথে ব্যবহারকারী দ্বারা সৃষ্ট কন্টেন্ট তৈরিতে এবং বিনিময়ে অনুমতি দেয়।” সংজ্ঞাটা একটু কঠিন হয়ে গেল তাই না? আসলে আমি যখন এটা বাংলায় অনুবাদ করেছিলাম তখন আমারও মনে হয়েছে এই সব কি জিনিস!!! সোজা কথায় সোশ্যাল মিডিয়া হল এমন কিছু সফটওয়্যার বা সাইট যা দুইজন কিংবা দুইয়ের অধিক মানুষের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। সাধারণত অনলাইনে যেসব সাইটে প্রশ্ন-উত্তর আদান প্রদান করা যায়, ভিডিও দেখার সাইট, ব্লগিং, পডকাস্টিং সাইট গুলো, ফটো শেয়ারিং, মুভি রিভিউ এর সাইট, সোশ্যাল নেটওয়ার্কস কিংবা অনলাইন ফোরাম গুলোকেই এককথায় সোশ্যাল মিডিয়া বলা হয়। অর্থাৎ যেসব সাইটে মানুষজন ভার্চুয়ালি মিলিত হয় এবং মতামত প্রকাশ করতে পারে সে জায়গাটাই হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া। এখন নিশ্চয়ই সবাই মনে মনে ভাবছেন ‘ধুর এটা তো আগেই জানতাম’ :-B এখন আসা যাক সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর ব্যাপারে। freebase.com এর মতে, সোশ্যাল মিডিয়াতে কোন বিষয়ে কিংবা বস্তুর প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করার পদ্ধতিই হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং। কিভাবে আমরা সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ব্র্যান্ড/প্রোডাক্ট/সার্ভিস কিংবা market offering কিভাবে উপস্থাপন করব এবং কি করলে সেগুলো সবাইকে আকর্ষিত করবে সেটাই ধাপে ধাপে আমরা শিখব। প্রচলিত মিডিয়া বলতে আমরা যা বুঝি তার সাথে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর সুক্ষ কিন্তু স্পষ্ট একটি পার্থক্য রয়েছে। যখন আপনি টিভি কিংবা পেপারে অর্থের বিনিময়ে আপনার ব্যাবসার বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন ভোক্তাদের কাছে তা তুলে ধরার জন্য সেখানে সোশ্যাল মিডিয়াতে আপনার নিজেকে ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানোর জন্য মিডিয়া তৈরি করে নিতে হবে। যেটা হতে পারে ব্লগ লিখে, ফেসবুকে এড দিয়ে কিংবা বিভিন্ন ফোরামে আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়ে। ইন্টারনেট জগতে যদি আমরা আমাদের পণ্য কিংবা ব্র্যান্ডকে আরও সামাজিক ভাবে উপস্থাপন করতে পারি তাহলে প্রচলিত মার্কেটিং এর থেকে আরও সহজে এবং কার্যকর ভাবে গ্রাহক/ভোক্তাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারব।

প্রচলিত মার্কেটিং বা ট্র্যাডিশনাল মার্কেটিং এর সাথে সোশ্যাল মিডিয়ার কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। যেমনঃ

>>> ট্র্যাডিশনাল মার্কেটিং অপেক্ষাকৃত স্থির। বিলবোর্ড কিংবা প্রিন্ট এডে যা থাকে তা পরিবর্তন করা যায় না। অপরদিকে সোশ্যাল মার্কেটিং dynamic অর্থাৎ গতিশীল। প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তন হতে পারে, সেটা নির্ভর করে আপনার সোশ্যাল মিডিয়া পলিসি কিংবা লক্ষ্যর উপর।
>>> ট্র্যাডিশনাল মার্কেটিং এ আপনি সাথে সাথে একশন নিতে পারবেন না, সোশ্যাল মার্কেটিং এ সুযোগ রয়েছে। যেমন আপনি চাইলেই একটি প্রিন্ট/সংবাদপত্র বিজ্ঞাপনের ম্যাসেজ এডিট করে নিতে পারবেন না, সোশ্যাল মিডিয়ায় কিন্তু এই সুযোগটা রয়েছে।
>>> ট্র্যাডিশনাল মার্কেটিং এ ফিডব্যাক পাবার সুযোগ নেই। টিভি তে এড দেখে নিশ্চয়ই গ্রাহকরা আপনাকে ফোন কল কিংবা SMS দিয়ে রিপ্লাই জানাবে না। সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এ কিন্তু এটা সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট।
>>> কোন নির্দিষ্ট গ্রুপ কিংবা বিশেষ টার্গেটকে ফোকাস করে আগানো ট্র্যাডিশনাল মার্কেটিং এ প্রায় অসম্ভব, অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এ আপনি যে কাউকে টার্গেট করে আগাতে পারবেন।
>>> ট্র্যাডিশনাল মার্কেটিং সর্বত্র বিরাজমান, অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং সেখানেই ভোক্তাদের খুজে নেয় যেখানে ভোক্তাদের দরকার। যেমনঃ কোথায় ঘুরতে যাবেন কিংবা এই ইদে কি পোশাক পড়বেন সেটা জানার জন্য গুগল/ ফেসবুকে সার্চ দিলে কিন্তু এর সাথে সম্পর্কিত অনেক সাজেশন কিংবা বিজ্ঞাপন দেখায়।
>>> কারা কারা আমার বিজ্ঞাপনটি দেখেছে কিংবা কাদের কাছে আমার বিজ্ঞাপনের ম্যাসেজ যাচ্ছে তা নির্ণয় করা প্রচলিত মার্কেটিং ব্যাবস্থায় প্রায় অসম্ভব। কিন্তু আপনি চাইলে খোজ রাখতে পারেন আপনার সাইট কিংবা facebook পেইজের track history চেক করলেই।
>>> ট্র্যাডিশনাল মার্কেটিং সারা পৃথিবীজুড়েই বিসৃত, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়া/ইন্টারনেট ব্যাবহারকারী পর্যন্ত বিসৃত।

সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর বাজারজাতকরন মিশ্রণ অর্থাৎ মার্কেটিং মিক্স এর উপাদান সমূহঃ
যেকোনো ধরনের মার্কেটিং এর প্রধান উদ্দেশ্য থাকে পণ্য কিংবা ব্র্যান্ডকে যতটা সম্ভব টার্গেট কাস্টমারদের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া। টার্গেট মার্কেট বলতে বোঝানো হয়েছে, এমন এক গোষ্ঠী/ভোক্তা, যাদেরকে উদ্দেশ্য করে কোম্পানি তাদের মার্কেটিং কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই টার্গেট কাস্টমারদের চাহিদা ও প্রত্যাশা অনুযায়ী এবং কোম্পানির মার্কেটিং স্ট্রাটেজি উপর ভিত্তি করে কোম্পানি কিছু মার্কেটিং উপাদান (Marketing tool) নির্ধারণ করে। এসব মার্কেটিং উপাদানের মিশ্রন হচ্ছে বাজারজাত করন মিশ্রন বা Marketing Mix। Marketing mix এর ব্যাপারে প্রথম ধারণা দিয়েছেন Professor Neil H. Bordan ১৯৪৮ সালে এবং Professor James Coolton এটি উন্নত করেন। পরবর্তীতে E. J. McCharthy, Philip Kotler , W. J. Stanton সহ প্রভূত মার্কেটিং গুরু Marketing Mix ধারনাটিকে ডেভেলপ করেন। সহজ ভাষায়, মার্কেটিং করার জন্য কোম্পানি যেসব চলক (variable) ব্যাবহার করেন তার সমন্বিত রূপ হচ্ছে মার্কেটিং মিক্স। E. J. McCarthy ১৯৬০ সালে Marketing mix এর চারটি চলক হিসেবে 4Ps প্রস্তাবনা করেন যেগুলো হল Product, Price, Place, Promotion। ১৯৮১ সালে 4Ps এর বর্ধিতরূপ 7Ps তত্ত্ব এসেছে যেখানে অতিরিক্ত তিনটি চলক People, Process, Physical এর প্রস্তাবনা করা হয়েছে। যারা Marketing Mix নিয়ে আরও পড়াশুনা করতে চান তারা Philip Kotler এবং Gary Armstrong এর ‘Principle of Marketing’ এর সেকেন্ড চ্যাপ্টার ফলো করতে পারেন। সেই সাথে উইকিপিডিয়া তো রয়েছেই। তবে এখানে কেন মার্কেটিং মিক্স নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে সেটা সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং নিয়ে আমার ২য় পর্বে বিস্তারিত আলোচনা করব। এখন জেনে নেওয়া যাক সোশ্যাল মিডিয়ার মার্কেটিং মিক্স কি কি হতে পারেঃ

8Ps of Social Media Marketing
সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর জন্য অনেক variable প্রস্তাবনা করেছেন এর মধ্য ৮টি variable কে আমার কাছে যৌক্তিক মনে হয়েছে।


[বড় করে দেখুন]

১/> People: চিহ্নিত করুন আপনার টার্গেট মার্কেট কারা। ইন্টারনেটে কে হচ্ছে আপনার জন্য আদর্শ ভোক্তা?
২/> Purpose: জানুন কেন আপনি সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করবেন? সেটা কি আপনার ভোক্তাদের মেইলিং লিস্ট আপডেট করার জন্য নাকি আপনার ওয়েবসাইটের হিট বাড়াবার জন্য? অথবা সেটা হতে পারে নির্দিষ্ট কোন বয়সের বা একই বৈশিষ্ট্যর কিছু লোকদের কাছে আপনার পণ্যর পজিশনিং করা।
৩/> Platform: ঠিক করে নিন কোন সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম ব্যাবহার করলে আপনার জন্য সবচেয়ে বেশি লাভজনক হবে। যেমনঃ আপনি যদি কোন রেস্টুরেন্ট এর সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করতে চান তাহলে facebook কিংবা foursquare প্লাটফর্ম হতে পারে। আপনি যদি আপনার নিউজ সাইটের সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করতে চান তাহলে আমদের সামু বেশ লাভজনক। কারন এখানে অনেক মানুষ আছে এবং আসে যারা দেশ-বিদেশের খোজ রাখতে আগ্রহী। আবার আপনি যদি আপনার মোবাইল সেটের মার্কেটিং করতে চান সেক্ষেত্রে Flickr, Pinterest, facebook, অনলাইন ফোরাম দারুন হতে পারে। কারন মোবাইল কেনার আগে এর ফিচার দেখার পাশাপাশি জিনিসটি দেখতে কেমন, অন্যান্য ইউজারদের রিভিউ কি তা জানতেও মানুষ বেশ আগ্রহী।
৪/> Plan: পরিকল্পনা করুন আপনি কি আপনার কোম্পানির মার্কেটিং করবেন নাকি কোম্পানির নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের? নাকি কোম্পানির সুনির্দিষ্ট কোন প্রোডাক্ট/সার্ভিসের? কে আপনার পণ্যর সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর কাজটি করে দিবে, ঠিক কখন আপনার পেইজকে আপডেট করবেন, আপনার সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর লক্ষ্য কি হওয়া উচিৎ, সেই লক্ষ্য আপনি কিভাবে এবং কতদিনে অর্জন করবেন এসব প্রশ্নের উত্তর কিন্তু আগে থেকেই ঠিক করে রাখতে হবে।
৫/> Policy: একটি স্বচ্ছ পলিসি এবং বিধান তৈরি করে ফেলুন আপনার সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর জন্য। যেমন, কোন পরিস্থিতিতে কিভাবে প্রতিক্রিয়া করবেন, কিভাবে আপনার ব্র্যান্ডকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যবহার করা যেতে পারে, আপনার ফ্যান কিংবা Subscriberদের সাথে কতটা গভীরভাবে সম্পর্ক রক্ষা করবেন।
৬/> Produce Content: আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় কি কি কন্টেন্ট অথবা কি কি তথ্য শেয়ার করবেন সে ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। কোন কিছু শেয়ার দেবার আগে একবার ভেবে দেখুন পোস্টটি সত্যিকার অর্থেই শেয়ার দেবার মত হয়েছে কি? সেটা আমার ফ্যান অথবা সাবস্ক্রাইবাররা গ্রহণ করবে কি?
৭/> Presentaiton: সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর অন্যতম ভ্যারিয়েবল হচ্ছে উপস্থাপন। আপনি আপনার প্রোডাক্ট, ব্র্যান্ড, সার্ভিস, কোম্পানিকে কতটা সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য ভাবে হাজির করতে পারবেন তার উপর আপনার সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এ সফলতা নির্ভর করে। অনেক সময় বিশেষ কোন দিনকে নিয়ে বড় বড় লেখা না দিয়ে গুছিয়ে ৮০ শব্দের মধ্যে কিংবা ছবির ভিজুয়াল আকারে মনের ভাব উপস্থাপন করতে পারলে সেটা আরও গ্রহণযোগ্য হয়।
৮/> Performance Measurement: দিনশেষে কিছু কিছু প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে, সারাদিনে কি করলেন আর কি করতে পারলেন না? আপনি কতটা সফল? জানার চেষ্টা করুন facebook ইনসাইট কি জিনিস, এনালিটিক্যাল টুল গুলো কিভাবে ব্যাবহার করতে হয়। কি পরিমাণ নতুন সাবস্ক্রাইবারকে আপনার সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং নাগাল পেল কিংবা আপনার টার্গেট মার্কেটের জন্য বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং কতটা কার্যকরী এসব জানার এবং মাপার চেষ্টা করুন।

অনেকে Product, Process এবং Personalization কেও মার্কেটিং মিক্স এর উপাদান হিসেবে গণ্য করেছেন। তবে আমার নিজের মনে হয়েছে Presentation উপাদানটি দ্বারা Process এবং Personalization কে ব্যাখ্যা করা যায় এবং Plan এর মধ্যে Product ঢুকে যাবে। কেউ কেউ Performance Measurement কে মার্কেটিং মিক্স এর উপাদান মানতে চান না। এক্ষেত্রে আমার নিজের মনে হয়েছে অন্যান্য উপাদান এর পাশাপাশি Performance Measurement একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যদি নিজেদের কাজের ফলাফল পরিমাপ করতে না পারি তবে তার সক্ষমতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। এ কথা আমি স্বীকার করে নিচ্ছি যে, যেসব উপাদান আমার কাছে যৌক্তিক মনে হয়েছে সেসব আমি যুক্ত করেছি। উপরের ৮টি উপাদানের মধ্যে সংযোজন কিংবা বিয়োজন হতেই পারে। সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং, ব্রান্ডিং নিয়ে কাজ করেন এমন গুরুরা এটি নিয়ে আলোচনা করতে পারেন।এবং এটি অবশ্যই সমালোচনার দাবী রাখে।

কেন করবেন সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং?

নিজের বিশ্লেষণের সুবিধার্থে এই প্রশ্নটিকে আমি দুইভাগে ভাগ করে নিচ্ছি।

প্রচলিত মার্কেটিং কি কার্যত মৃত?
যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মার্কেট গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান Customer Reference Forum এর প্রেসিডেন্ট Bill Lee কিছুদিন আগে Havard Business Review তে প্রায় একই শিরোনামে একটি নিবন্ধে দাবী করেছে প্রচলিত মার্কেটিং ব্যাবস্থা কার্যত অর্থেই অচল। এর পিছনে তিনি কিছু কারণ উল্লেখ করেন, এখন আর ভোক্তাগণ তাদের সিদ্ধান্ত নেবার সময় প্রচলিত মার্কেটিং ব্যাবস্থা কে প্রাসঙ্গিক মনে করছেন না। এই দাবীর যথার্থটা প্রমানে তিনি নিজের গবেষণা ও অনুসন্ধান নজরে এনেছেন। ক্রেতারা এখন আর মার্কেটার এর কথার উপর নির্ভর করতে চায় না। তারা চায় নিজস্ব উপায়ে মার্কেটারের প্রোডাক্টের ব্যাপারে তথ্য পেতে। প্রচলিত মার্কেটিং ব্যাবস্থার উপর তাদের এই বিশ্বাসের ঘাটতির মেটানোর সুযোগ রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এ। বিশ্বায়নের যুগে সহজে তথ্য পাবার সুযোগের কারনে ক্রেতারা এখন আগের থেকে জ্ঞানী এবং প্রোডাক্ট সম্পর্কে দিনকে দিন সচেতন হয়ে উঠেছে। তারা কোন প্রোডাক্ট কিংবা সার্ভিস ভোগ করার আগে ইন্টারনেট, ফার্মের বাইরের উৎস থেকে খোজ খবর নেবার চেষ্টা করেন। এসব ক্ষেত্রে ক্রেতার মনে ‘ওয়ার্ড অব মাউথ’ কিংবা কাস্টমার রিভিউ ব্যাপক প্রভাব ফেলে। যা ব্যাবহারের পুরোটা সুযোগ রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এ।

বিল ল’র দ্বিতীয় যুক্তি হল ২০১১ সালের একটি গবেষণার রিপোর্টে বলা হয়েছে ৭৩% CEO অর্থাৎ কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মনে করছেন তাদের CMO বা প্রধান মার্কেটিং কর্মকর্তা ভোক্তাদের কাছে কোম্পানির বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। যার ফলশ্রুতিতে কোম্পানি তাদের প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়নি। লন্ডন ভিত্তিক Fournaise Marketing Group নামের একটি রিসার্চ গ্রুপ প্রায় ৬০০ জন CEO ও ডিসিসন মেকারের উপর অনুসন্ধান চালিয়ে এই গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করেন। CEO রা অভিযোগ করেছেন ৭২% প্রধান মার্কেটিং কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে অর্থ দাবী করে বসেন। যার বিনিয়োগে কোম্পানির কি লাভ হবে, প্রবৃদ্ধি কত শতাংশ বৃদ্ধি পাবে তা বোঝাতে প্রধান মার্কেটিং কর্মকর্তারা ব্যর্থ হয়েছেন। যখন প্রধান মার্কেটিং কর্মকর্তাদেরকে মার্কেটিং-রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট বাড়ানোর কথা বলা হয় তখন তারা ভাবে CEO হয়ত তাদের বাজেট কমিয়ে দেবার কথা ভাবছেন কিংবা তাদের নিজেদের খরচ কমানোর জন্য বলছেন। যার ফলে প্রধান মার্কেটিং কর্মকর্তারা তাদের হাতে থাকা মার্কেটিং ক্যাম্পেইন গুলো কমিয়ে দেয়, মার্কেটিং টিম ছেঁটে ফেলে, থার্ড পার্টি পার্টনারদের, এজেন্সিদের সাথে নতুন করে নেগোসিয়েশন এ বসে। কিন্তু তার ফলে মার্কেটিং রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট বাড়ার বদলে নেগেটিভ হয়ে যায়। গবেষণাটি পড়ে দেখা যাচ্ছে যে CEO এর সাথে CMO এর চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে একটি ঘাটতি বেড়েই চলছে। যার জন্য প্রচলিত মার্কেটিং ব্যাবস্থার উপর আস্থা দিনকে দিন কমে যাচ্ছে।

তৃতীয়ত, ক্রমবর্ধমান বেড়ে চলা সোশ্যাল মিডিয়া আবার চারপাশের পরিবেশে ব্যাপক ভুমিকা রাখছে সেখানে প্রচলিত মিডিয়া সেভাবে অনুভূতি জাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। আপনাদের মধ্যে কতজন আছেন যারা নিয়মিত প্রতিদিন বিনোদনের আশায় টিভি দেখতে বসেন? ২বছর আগে টিভি দেখার পিছনে যেই সময়টা ব্যায় করতেন এখন কি সেরকম সময় ব্যায় করেন? অপরদিকে ২বছর আগে ইন্টারনেটের পিছনে যেই সময় ব্যায় করতেন এখন কি তার থেকে বেশি না কম? গত একসপ্তাহে চলার পথে কয়টা বিলবোর্ড এর নাম মনে করতে পারেন? কিংবা আজকের পেপারের প্রথম পাতায় যেই বিজ্ঞাপনটা দিয়েছে তা স্মরণ করতে পারছেন কি? এবার যদি আমরা একটু গভীরে যাবার চেষ্টা করি তাহলে দেখুন এইসব প্রচলিত মার্কেটিং ব্যাবস্থার পিছনে কারা রয়েছে? কোম্পানির নিজস্ব কর্মচারী-কর্মকর্তা, এজেন্সি, কনসালটেন্ট কিংবা থার্ড পার্টি পার্টনার। একবার ভেবে দেখেছেন কি, এরা কেউ কি ভোক্তা কিংবা ক্রেতাশ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে কিনা?

বিল লি যেভাবে জোরালো ভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে প্রচলিত মার্কেটিং ব্যাবস্থা মৃত তার ঠিক বিপরীত থিউরি নিয়ে হাজির হয়েছেন Adam Smith Institute এর রিসার্চ ফেলো Tim Worstall। যিনি দাবী করছেন সোশ্যাল মিডিয়াও বর্তমানে প্রচলিত কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলছে যার বড় প্রমান আমেরিকার মার্কেটে ফেসবুকের গ্রোথ কমে যাওয়া। এই ঘাটতি পূরণে প্রধান মার্কেটিং কর্মকর্তারাদের আরও সফল স্ট্রাটেজিক মার্কেটিং কনসেপ্ট রেডি করে তা কাজে লাগানোর ব্যাপারে জোর দিয়েছেন। কিছুদিন আগে তিনি ফোর্বস ডট কমে একটি নিবন্ধ লিখেন Maybe Business Should Not Invest In Marketing In Social Media Like Facebook and Twitter? প্রচলিত মার্কেটিং এ বিশ্বাস করবেন নাকি অন্য কোন পথ বেছে নিবেন এই বিতর্কে যোগ দিতে তার লেখাটিও পড়তে পারেন।

যদি বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বর্তমান অবস্থার দিকে তাকাই তাহলে আমার নিজস্ব মতামত হল প্রচলিত মিডিয়া এখানে এতটা খারাপ অবস্থানে পৌছায় নাই যে একে মৃত ঘোষণা করা উচিৎ। যদি লক্ষ্য করেন উপরের দুটি অবস্থানের পিছনে দুইটি ভিন্ন ভিন্ন সময়ের কথা বলা হয়েছে। বিল লি মূলত এমন এক সময়ের এবং সমাজের কথা বলেছেন যেখানে প্রচলিত মিডিয়া ম্যাচিউরড/পূর্ণবিকশিত পজিশনে চলে গিয়েছে এবং প্রায় সবধরনের মার্কেটিং টুল ব্যাবহার করা হচ্ছে। আমাদের বাংলাদেশ কিন্তু এখনও উন্নত দেশের মত সে অবস্থানে দিকে পৌছায়নি। অপরদিকে টিম ওরসাল এমন এক সময়ের কথা বলেছেন যখন সোশ্যাল মিডিয়া পিক সময়ে পৌঁছে গেছে যার ধারে কাছেও বাংলাদেশ বর্তমানে নেই। আমি প্রথমেই উল্লেখ করেছি প্রচলিত মিডিয়া এখানে এতটা খারাপ অবস্থানে পৌছায় নাই যে একে মৃত ঘোষণা করা উচিৎ। তবে তা সেদিকের পথেই আগাচ্ছে। যার বড় প্রমান আমি নিজে, যে টিভি দেখা একদম বন্ধ করে দিয়েছে, এমনকি বাস/গাড়ীতে চলাচলের সময় বিলবোর্ডের দিকে না তাকিয়ে মোবাইল টিপে কিংবা প্রতিচিন্তা টাইপ ম্যাগাজিন পড়ে সময় কাটায়। যারা অবাক হয়ে ভাবছেন কিভাবে প্রচলিত মার্কেটিং ব্যাবস্থা নিঃশেষিত হতে পারে যেখানে আমরা প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই বিজ্ঞাপনের সাগরে ডুব দেই! তাদের কে জানিয়ে রাখি ১০ বছর আগে কেউ যদি বলত একদিন ছাপা সংবাদপত্রের মৃত্যু ঘটবে। নিঃসন্দেহে তার বক্তব্যকে পাগলের প্রলাপ ছাড়া আর কি বলা যেত যখন পৃথিবীতে ছাপা সংবাদপত্রই সবচেয়ে প্রভাব বিস্তার করতে পারত। কিন্তু কিছুদিন আগেই জনপ্রিয় নিউজউইক যখন তাদের প্রিন্ট ভার্সন বন্ধ করে দিয়ে পুরোপুরি অনলাইনে চলে গেল তখন থেকে এই ধারণা আরও শক্তভাবে বিশ্বাস হতে শুরু করে। খেয়াল করে দেখেছেন আমাদের দেশের সবচেয়ে প্রচলিত দৈনিক প্রথম আলো কিংবা ডেইলি স্টার এর অনলাইন ভার্সন কিন্তু অনেক উন্নত করেছে। এমনকি যেকোনো সংবাদের শেষে কমেন্টও করা যায়। তারা এখন আইফোন কিংবা এন্ড্রয়েড এর জন্য অ্যাপস ডেভেলপ করছে। রাস্তার পাশে বড় বড় সুপার মার্কেটের পাশাপাশি ই-কমার্স সাইট গুলোও কিন্তু বেশ সফল হয়ে উঠছে দিনকে দিন। যেখানে প্রোডাক্ট নিজেই অনলাইনে/ ইন্টারনেট ভিত্তিক হয়ে যাচ্ছে সেখানে প্রচলিত মিডিয়া মার্কেটিং কেন হবে না? মার্কেটিং কিংবা ব্র্যান্ডিং নিয়ে যারা কাজ করেন তারা তাদের প্রোডাক্ট-ব্র্যান্ডকে ১০ বছর পর কোথায় এবং কিভাবে দেখাতে চান তা নিয়ে ভাবার সময় কিন্তু এখনই।

সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং কি সত্যি কাজ করে?

আজ থেকে প্রায় ৯মাস আগে যখন আমি এই ব্লগটি লেখার প্লান করেছিলাম, তখন আমি facebook, ইন্টারনেট থেকেই অনেক ইনফরমেশন, স্ক্রিনশট কালেকশন শুরু করে দিয়েছিলাম। বিভিন্ন কোম্পানি তাদের ব্র্যান্ডকে আরও সামাজিক ভাবে উপস্থাপন করার জন্য কি কি করে সেটা দেখার জন্য সবসময় facebook, google+, Pinterest, tumbler, Linked in, twitter এ অনেক ঘোড়াঘুড়ি করেছি। সারা বিশ্বে যখন সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং কনসেপ্ট চালু হয়ে গেছে, তখন বাংলাদেশে হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানি নিজের প্রোডাক্ট/ব্র্যান্ডের সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং চালু করেছিল। রিসেন্ট কয়েকমাসে সেটা বাড়তে শুরু করেছে দ্রুত গতিতে। এটা বেশ ভালো লেগেছে যে বাংলাদেশী কোম্পানিগুলো বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে দ্রুত চেষ্টা করছে। তবে অনেকের মধ্যে হয়ত এই মনোভাব হতে পারে যে সোশ্যাল মিডিয়াতে যোগদান করলে কিংবা নিজের প্রোডাক্ট/ব্র্যান্ডে কে সোশ্যাল মিডিয়াতে উপস্থাপন করলে রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট বাড়বে, কিংবা সেটা তার সেলসে পজিটিভ ইফেক্ট ফেলবে অর্থাৎ এর কোন আর্থিক প্রভাব পড়বে। কিন্তু ব্যাপারটি সেরকম নয়। মার্কেটিং এর অন্যান্য চ্যানেলে এ যেভাবে রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট বের করা হয় তার সাথে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট মাপা হয় এটি আপনার ভোক্তা/ক্রেতাদের মনে কি পরিমাণ প্রভাব ফেলতে পারছে তার উপর। সেভাবে সরাসরি এর আর্থিক প্রভাব লক্ষ্য করা যাবে না যেটা অন্যান্য মার্কেটিং চ্যানেল এর ক্ষেত্রে বের করা সম্ভব। তাই সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং আদৌ প্রভাব ফেলে কিনা সেটা সরাসরি বলাটা কঠিন। তবে সেটার অবশ্যই একটা পজিটিভ ফলাফল আছে যদি আপনি সঠিক ভাবে এটি সম্পূর্ণ করতে পারেন। ব্যাক্তিগত ভাবে আমি মনে করি সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর অবশ্যই একটি সরাসরি প্রভাব রয়েছে সেলসের উপরে। আমি নিজেই একটি ফ্যাশন হাউজ থেকে প্যান্ট কিনেছিলাম। ফ্যাশন হাউজটির ফেসবুক পেইজে জানানো হয়েছিল যারা এই পেইজের ফ্যান শুধুমাত্র তারাই ডিসকাউন্ট পাবে। আমি সাথে সাথে অফারটি লুফে নিয়েছিলাম।

আমি এখানেই কিভাবে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট বের করতে হয় সেটা আলোচনা করব না। আপনাদের সারা পেলে সামনে হয়ত এটা নিয়ে কিছু একটা লিখার চেষ্টা করব।

ফ্লোরিডা ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Marketing Sherpa কয়েকবছর ধরে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট বের করার পদ্ধতি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে আমেরিকায় যেসব কোম্পানি সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করে তারা সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর ফলাফল পাওয়া নিয়ে সন্তোষ মনোভাব পোষণ করে। তবে একেক কোম্পানির ক্ষেত্রে এই মনোভাব পরিবর্তিত হয় সংশ্লিষ্ট কোম্পানির নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া পলিসি এবং লক্ষ্যের উপর। সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করছে এমন কোম্পানির চিফ মার্কেটিং অফিসার অথবা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে Marketing Sherpa এর গবেষকরা কথা বলে দেখতে পেয়েছেন, ৬৪% মনে করছেন সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং একটি চমৎকার কৌশল এবং তাদের রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট কে উল্লেখযোগ্য বেগবান করছে। সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর পিছনে বাড়তি মনোযোগ দিবেন কিনা এ ধরনের একটি প্রশ্নের বিপরীতে তারা জানিয়েছেন, অবশ্যই করা উচিৎ তবে সেটা সঠিকমাত্রায় এবং রক্ষণশীলভাবে। ২০% মনে করছে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং সত্যি কার্যকরী ও আশাপ্রদ এবং আরও কিছুদিন এটার পিছনে ইনভেস্ট করা যায়। ১০% জানিয়েছেন যদি সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং ফ্রিতে চালিয়ে যাওয়া যায় তবে তারা সেটা চালিয়ে যাবেন। সর্বশেষ ৬% মনে করছে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং সত্যিকার ভাবে তাদের রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট এ তেমন কোন প্রভাব ফেলছে না। আরও চালিয়ে যাবেন কিনা এধরণের প্রশ্নে তারা মত দিয়েছেন, প্রশ্নই উঠে না। গবেষণা রিপোর্টি দেখে বুঝা যাচ্ছে ৬৪% CMO (Chief Marketing Office) সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর কার্যকারিতার ব্যাপারে সুনিশ্চিত। এমনকি শেষের ৬% বাদে কেউই এই ব্যাপারে নেগেটিভ আচরণ করেনি। তবে এক্ষেত্রে একটি ব্যাপার আপনাদের জানা উচিৎ, সব ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে যে আপনার রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট এক ধরনের আসবে ব্যাপারটা সেরকম নয়। কোথায় সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করলে সর্বোত্তম কার্যকরী হবে এ ব্যাপারে এই ব্লগের শেষে কিংবা পরের পোস্টে আলাদা করে আলোচনা করব।

Leon G. Schiffman এবং Leslie Lazar Kanuk তাদের Consumer Behavior বইতে উল্লেখ করেছেন
“ Savvy marketers today realize that in order to outperform competitors they must achieve the full profit potential from each and every customer. “
অর্থাৎ একজন দক্ষ এবং সচেতন মার্কেটার জানে, তার প্রতিযোগীদের ছাড়িয়ে যেতে হলে তাকে প্রতিটি কাস্টমারদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ মুনাফা বের করে আনতে হবে। যদি তাই হয় তাহলে আপনার কি এখনই সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং নিয়ে মনযোগী হওয়া উচিৎ নয়? যেখানে ৯৪% CMO সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর ফলাফল সম্পর্কে পজিটিভ ধারণা পোষণ করে।

তবে এতদিন ধরে ইন্টারনেট, জার্নাল, ব্লগ, বই পড়ে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং নিয়ে কাজ করার পর আমার মনে হয়েছে অনন্ত ৪টি কারনে হলেও আপনার উচিৎ সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর প্রতি মনোযোগ দেওয়া।

[বড় করে দেখুন]

১. ব্র্যান্ড মনিটরঃ সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এজেন্সি হিসেবে কাজ করে এমন একটি প্রতিষ্ঠান Attensity এর সোশ্যাল মিডিয়া ডিরেক্টর Maria Ogneva এর মতে, সোশ্যাল মিডিয়া একটি বড় ককটেল পার্টি এর মতন। যেখানে বিভিন্ন মতের মানুষ বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে জড়ো হয় যোগাযোগের জন্য অথবা কোন কিছু শেয়ার করার উদ্দেশ্যে। এসব কথোপকথনের কিছু হয়ত আপনাকে নিয়ে হতে পারে, কিছু হয়ত আপনার ব্যাবসা নিয়ে হতে পারে আবার কিছু হয়ত ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে হতে পারে। যেসব জানাটা আপনার জন্য দরকার। এসবের কিছু হতে পারে এমন কিছু মানুষের যারা আপনার পণ্যটি খুঁজছে কিংবা আপনার ভুল গুলো ধরিয়ে দিচ্ছে। আপনি যদি এগুলো নাও শুনতে চান তাও এসব কথাবার্তা চলবেই। আপনি যদি এগুলো না শোনার চেষ্টা না করেন এসব কোনদিনই জানবেন না।

২. কাস্টমারদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করাঃ কোম্পানির অফিশিয়াল spokesman অর্থাৎ মুখপাত্র হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যাবহার করতে পারেন। আপনার নতুন অফার কি, কাস্টমার সার্ভিস সেবা প্রদান, কোন সমস্যা সম্মুখীন হলে তাৎক্ষণিক জানানো/ ক্ষমা চেয়ে নেওয়া এসব করতে পারবেন সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করে।

৩. কোম্পানির নিজস্ব জনবলের মধ্যে সম্পর্ক/যোগাযোগ উন্নয়নঃ সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং মানে যে শুধু facebook পেইজ খুলে নিজের গুণ-মন্ত্রণা প্রচার করা ব্যাপারটা এমনটাই নয়। এর কার্যকারিতা পরিধি আরও ব্যাপকভাবে বিসৃত এবং সেটা নানা ভাবে ব্যাবহার করতে পারবেন। অনলাইন ফোরামে কিংবা facebook গ্রুপে কোম্পানির নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে যোগাযোগ মাধ্যম তৈরি করে দেওয়া কিংবা তাদের সঠিক নির্দেশনা প্রদান, যথাযথ motivation দেওয়ার কাজটিও করা যেতে পারে।

৪. নতুন রিক্রুটদের খুজে বের করার কাজেঃ আজকাল অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যাবহার করে এই কাজটি করছে। ভার্সিটির ফ্রেশ গ্রাজুয়েটদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে তাদের মধ্যে থেকে বেস্ট রিক্রুটদের খুজে বের করে আনতে অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ার সুযোগ নিচ্ছেন। এই পদ্ধতি দিয়ে পুরনো কর্মচারীদের ফিরিয়ে আনার কাজটিও করা যেতে পারে।

সবশেষে কিছু পরিসংখ্যান দিয়ে এই পার্টটা শেষ করে দিচ্ছি।
লন্ডনভিত্তিক জনসংযোগকারী প্রতিষ্ঠান Kiss PR গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লন্ডনে একটি গবেষণা চালিয়েছেন। যাতে প্রায় ১০০জনের বেশি পূর্ণ বয়স্ক ব্যাক্তি অংশ নিয়েছেন। গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে তাদের ব্যাক্তিগত ধারণা এবং প্রতিক্রিয়া জানা। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে শতকরা ৮৯ জন সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্তত একটি ব্র্যান্ডকে নিয়মিত অনুসরণ করেন। ৫১% জন জানিয়েছেন যদি কোন কোম্পানি সোশ্যাল মিডিয়ায় অবস্থান কিংবা সক্রিয় না থাকে তবে সেসব কোম্পানির প্রতি তাদের একটি নেগেটিভ মনোভাব তৈরি হয়। শতকরা ৬৩ জন জানিয়েছেন, কোন কোম্পানি কিংবা ব্র্যান্ড সম্পর্কে জানতে তারা সোশ্যাল মিডিয়ার ধারস্ত হয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যাবহার করার প্রধান কারন কি জানতে চাইলে শতকরা ৩৮ জন জানিয়েছেন ব্যাবসায়িক উদ্দেশ্যে সোশ্যাল মিডিয়ার সাথে যুক্ত হয়েছেন অপরদিকে শতকরা ৪জন জানিয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের প্রধান কাজ স্ট্যাটাস আপডেট করা। ১৮-২৫ বয়সীদের মধ্যে শতকরা ৪৩ জন জানিয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়ায় মার্কেটিং দেখে কিংবা প্রভাবিত হয়ে তারা কিছু না কিছু কিনেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্তত একটি ব্র্যান্ডকে নিয়মিত অনুসরণ করেন শতকরা ৮৯ জন।

এখন আপনিই ঠিক করুন। সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করবেন নাকি করবেন নাকি এই ব্লগটি এখানেই পড়া থামিয়ে দিবেন।

কোথায় করবেন সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং?

উইকিপিডিয়ার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এ পৃথিবীতে প্রায় ২০০টির অধিক সোশ্যাল মিডিয়া সাইট জনপ্রিয় রয়েছে। যার সবকয়টিতেই কি আপনি সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করে বেড়াবেন? অবশ্যই না। যেসব সাইটে আপনার কাস্টমার, ক্রেতারা বেশি পাওয়া যায় সেসব জায়গাতেই মার্কেটিং করলে সফল হবেন। নয়ত ব্যাপারটা অনেকটা উলু বনে মুক্ত ছড়ানো (অপাত্রে/অস্থানে মূল্যবান দ্রব্য প্রদান) এর মত হয়ে যাবে। যদি আপনি সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং থেকে সর্বোচ্চ রিটার্ন পেতে চান তাহলে নির্দিষ্ট কোন সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মের উপর নির্ভর করবেন না। একসাথে কয়েকটি সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম এর উপর আপনার সোশ্যাল মিডিয়া স্ট্রাটেজি দাড়া করাতে হবে। সেটা হতে পারে facebook, twitter, instagram, youtube এর কম্বিনেশন কিংবা tumbler, Linked in, Flickr, foursquare সমন্বয়ে। তবে বর্তমানে facebook একাই অনেকটা কাভার দিচ্ছে দেখে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর জন্য অনেকেই শুধুমাত্র facebook কেই বেছে নিচ্ছে।

পৃথিবীর সব সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মকে সর্বমোট ৭ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

[বড় করে দেখুন]

=> সোশ্যাল নেটওয়ার্কসঃ সোশ্যাল নেটওয়ার্কস হল যেখানে সবাই ভার্চুয়ালি মিলিত হয়। সুখ দুঃখের আলাপ করে।

=> সোশ্যাল স্ট্রিমঃ যেসব সোশ্যাল মিডিয়াতে ভিডিও দেখা যায় কিংবা স্লাইড শো করে দেখানো যায়।

=> সোশ্যাল সার্চঃ যেসব সার্চ রেজাল্টের সাথে কাস্টমার/কন্ট্রিবিউটর রিভিঊ থাকে।

=> সোশ্যাল নলেজঃ যেসব সোশ্যাল সাইটে জ্ঞান শেয়ারিং হয়।

=> সোশ্যাল ব্লগিং: ব্লগাররা যেসব প্ল্যাটফর্মে ব্লগিং করে সেসব।

=> সোশ্যাল কাস্টমার সার্ভিসঃ কাস্টমাররা কিংবা ব্র্যান্ডের অতি উৎসাহী ভক্তরা যেসব সাইট পরিচালনা করেন।

=> সোশ্যাল বুকমার্কিং: যেসব সাইটে ইউজাররা তাদের পছন্দের জিনিস বুকমার্ক করে সবার সাথে শেয়ার করে।

অ্যালেক্সা র‍্যাংকিং অনুযায়ী সবচেয়ে পপুলার সোশ্যাল মিডিয়া সাইট গুলো লিস্টঃ
নাম (অ্যালেক্সা র‍্যাংকিং)
facebook (২) — ছোটদের-বড়দের-সকলের, facebook আমাদের সকলের। !:#P

twitter (৮) — মাইক্রোব্লগিং সাইট। সেলিব্রেটিরা মাঝে মাঝে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্লগ দেয় সেটাকে আবার ‘টুইট’ বলে! আমার নিজেরও আইডি আছে

Linked in (১২) — বিজনেসম্যান এবং প্রফেশনালদের facebook। খুব কাজের। আইডিয়াটা চরম। আগে ভুয়া ছিল। রিসেন্ট সময়ে পুরা ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

Sina Weibo (৩১) — চাইনিজ মাইক্রোব্লগিং সাইট। চাইনিজ ভাষায় লেখা সব। কিছুই বুঝি না। :(

Pinterest (৩৮) — আমার খুব ফেভারিট একটা সাইট। যা পছন্দের হয় পিন করে ফেলুন। 

Vkontakte (৩৮) — রাশিয়ানদের সোশ্যাল নেটওয়ার্কস। তারা মূলত গান শোনা এবং শেয়ার করার জন্য ইউজ করে। তাদের দাবী তারা ইউরপের সবচেয়ে বড় সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট।

Flickr (৪৮) — ফটোগ্রাফারদের তীর্থ স্থান। কত শত ভালো ভালো ফটোগ্রাফার যে উঠে এসেছে এটা থেকে। থ্যাংকস ইয়াহু । :)

Odnoklassniki (৬৫) — রাশিয়ায় জনপ্রিয় সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট। ইংরেজি নাম Classmate।

Renren (৯৫) — চায়নার facebook বলা হয় এটাকে।

Douban (১০৬) — বন্ধু, আড্ডা, গান টাইপের চাইনিজ সোশ্যাল নলেজ সাইট। বই, মুভি, গান এসব নিয়ে রিভিউ চাইনিজ ভাষায় পাবেন।

উপরের এগুলো হল সারা বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম। এখন আপনি কোন সোশ্যাল মিডিয়া গুলো ব্যাবহার করবেন তা নির্ভর করে ৩টি প্রশ্নের উপর।
১. আপনার সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর লক্ষ্য কি?
২. কোন সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনার টার্গেট মার্কেট বেশি অবস্থান করছে ?
৩. সেইসব সোশ্যাল মিডিয়ায় মার্কেটিং পরিচালনায় আপনি কি প্রস্তুত?

প্রশ্নের উত্তরের সাথে মিলিয়ে এবার সিদ্ধান্ত নিন আপনিই।

আজকে আপাতত এটুকুই। আসলে প্রথমে আমি ভেবেছিলাম সর্বোচ্চ ৮০০ শব্দের মধ্যে একটা ব্লগ দিয়ে দিব। কিন্তু লিখতে লিখতে প্রায় ৪০০০ হাজার ছাড়িয়ে গেল। আসলে আমার উচিৎ ছিল আরও সংক্ষেপে পুরো ব্যাপারটি তুলে ধরার। যেহেতু এই বিষয়টা নিয়ে এর আগে সেভাবে কেউ আগায়নি তাই আমি ভেবেছিলাম এমন একটি শক্ত benchmark তৈরি করে দিতে যাতে ভবিষ্যতে যারা এই টপিকে লিখবে তারা যেন এর থেকে ভালো ও খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে লিখে। যারা আসলেই সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং নিয়ে কাজ করতে চান তারা পুরো লিখাটিকে কয়েকবার পড়বেন। কারন প্রথমবারেই সবকিছু ক্লিয়ার হয়ে যাবে কিংবা আমি যা বোঝাতে চেয়েছি সেটাই বুঝে যাবেন এমন না। আর হ্যাঁ, যদি আপনাদের এই ব্লগটি ভালো লেগে থাকে তবে আমার জন্য কিছু কাজ করে দিনঃ
১. এই লিংকে গেলে একটা Interest list দেখতে পাবেন। বাংলাদেশে/বাংলাদেশী যেসব ব্র্যান্ড ফেসবুকে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করছে তাদের একটা লিস্ট। আমি যেসব কোম্পানিকে ফেসবুকে খুজে পেয়েছি তাদেরকে নিয়ে এই লিস্টটা করেছি। হয়ত আরও অনেক পেইজ থাকতে পারে যা আমার চোখে পড়েনি। দয়া করে এই ব্লগে কিংবা আমার মেইলে সেইসব পেইজের লিংক দিয়ে দিবেন। যদি আপনি এই Interest list টা subscribe করে রাখেন তাহলে এই লিস্টের সব পেইজের আপডেট একসাথে পাবেন।
একই সাথে বাংলাদেশ সরকারের কোন মন্ত্রণালয় কিংবা ডিপার্টমেন্ট অথবা কোন প্রজেক্টের facebook পেইজ থাকলে সেগুলোর লিংকও আমাকে দিন।
আর এই Interest list টা হল আমার নিজের পছন্দের কিছু facebook পেইজের লিস্ট।

483 Total Views 1 Views Today
ad by Awesome Technologies
Share